আপডেট
স্বাগতম! ইসলামিক সঠিক জ্ঞান নিয়ে ”ইসলামী জীবন” আপনার পাশে। নিয়মিত ভিজিট করুন, দেখুন বিষয়ভিত্তিক পোস্টগুলো আর শিখতে থাকুন... হোয়াটসেপ সার্ভিসে জয়েন হতে “Post” লিখে সেন্ড করুন এই “01511993330” হোয়াটসেপ নাম্বারে। আমাদের ওয়েবসাইট www.islamijibon.net । ধন্যবাদ!
বাংলা ভাষায় অলাভজনক বৃহত্তম ইসলামিক ওয়েবসাইট বানানোর প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছে ইসলামী জীবন টিম। আসছে মোবাইল অ্যাপলিকেশন... সাইট www.islamijibon.net

শনিবার, ৯ মে, ২০২০

ফয়যানে লাইলাতুল ক্বদর (পর্ব-২)

এক হাজার শাহজাদা

সূরা ক্বদরের অন্য এক শানে নুযুল হচ্ছে, প্রসিদ্ধ তাবেঈ হযরত সায়্যিদুনা কাবুল আহবার رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বনী ইস্রাঈলে এক সৎচরিত্রবান বাদশাহ ছিলেন। আল্লাহ ওই যুগের নবী عَلَيْهِ السَّلَام এর প্রতি ওহী প্রেরণ করেন, অমুককে বলো, তার কি ইচ্ছা তা পেশ করতে। যখন তিনি সংবাদ পেলেন, তখন আরয করলেন, হে আমার মালিক! আমার আকাঙ্খা হচ্ছে, আমি আমার সমস্ত সম্পদ, সন্তান ও প্রাণ দিয়ে জিহাদ করবো। আল্লাহ তাআলা তাকে এক হাজার পুত্র সন্তান দান করলেন। সে তার একেকজন শাহজাদাকে তার সম্পদ সহকারে যুদ্ধযাত্রার জন্য প্রস্তুত করলেন। তারপর তাদেরকে আল্লাহ তাআলার রাস্তায় মুজাহিদ বানিয়ে প্রেরণ করতেন। সে এক মাস জিহাদ করতো এবং শহীদ হয়ে যেতো।
তারপর দ্বিতীয় শাহজাদাকে সেনা বাহিনীতে যোগদানের জন্য তৈরী করতেন। এভাবে প্রতি মাসে একেকজন শাহজাদা শহীদ হয়ে যেতো। তার পাশাপাশি বাদশাহ নিজেও রাত জেগে ইবাদত করতেন এবং দিনের বেলায় রোযা রাখতেন। এক হাজার মাসে তাঁর এক হাজার শাহজাদা শহীদ হলো। তারপর নিজে অগ্রসর হয়ে জিহাদ করলেন এবং শহীদ হয়ে গেলেন। লোকজন বলতে লাগলো, “এ বাদশাহর সমান মর্যাদা কেউ পেতে পারেনা। তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাযিল করেছেন
لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ
(তরজমা : শবে ক্বদর হাজার মাস অপেক্ষাও উত্তম।) অর্থাৎ: এ রাত ওই বাদশাহ্ رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ  হাজার মাস যাবত যে রাত জাগরণ, দিনে রোযা এবং জান, মাল ও সন্তানগণ সহকারে আল্লাহ তাআলার রাস্তায় জিহাদ করে অতিবাহিত করেছে, তা অপেক্ষাও উত্তম। (তাফসীরে কুরতবী, ২০ খন্ড, পারা ৩০, পৃষ্ঠা ১২২)

হাজার শহরের বাদশাহী

হযরত সায়্যিদুনা আবু বকর ওয়াররাক رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ  বলেন, “হযরত সায়্যিদুনা সুলাইমান عَلَيْهِ السَّلَام  এর রাজ্যে পাঁচশ শহর ছিলো। আর সায়্যিদুনা যুল কারনাঈন عَلَيْهِ السَّلَام এর রাজ্যেও পাঁচশ শহর ছিলো। এভাবে এ দু’জনের রাজ্যে এক হাজার শহর হলো। সুতরাং আল্লাহ তাআলা এই এক রাতের ইবাদতকে, যে সেটা পাবে, তার জন্য এ দু’টি রাজ্য অপেক্ষাও উত্তম করেছেন। (তফসীরে কুরতুবী, খন্ড ২০, পারা ৩০, পৃ ১২২)
প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! এ রাত সব দিক দিয়ে মঙ্গল ও শান্তির জামিনদার। এ রাত শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রহমতই রহমত। সম্মানিত মুফাসসিরীনগণ رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِمْ বলেন, “এ রাত সাপ, বিচ্ছু, বিপদাপদ ও শয়তান থেকেও নিরাপদ। এ রাতে শান্তিই শান্তি।”

পতাকা উড়ানো হয়

বর্ণিত আছে যে, “শবে ক্বদরে সিদ্রাতুল মুন্তাহার ফিরিশতাদের দল হযরত জিব্রাঈল عَلَيْهِ السَّلَام এর নেতৃত্বে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়। তাঁদের সাথে চারটি ঝান্ডা থাকে। একটি ঝান্ডা হুযুর আনওয়ার ﷺ এর রওযায়ে মুনাওয়ারের উপর, একটি ঝান্ডা বায়তুল মুকাদ্দাসের ছাদের উপর, একটি ঝান্ডা কাবা শরীফের ছাদের উপর এবং আরেকটা ঝান্ডা তূরে সিনার উপর উড়িয়ে দেয়া হয়। তারপর এ ফিরিশতাগণ মুসলমানের ঘরগুলোতে তাশরীফ নিয়ে গিয়ে প্রত্যেক মু’মিন নর ও নারীকে সালাম বলে। আর বলে, সালাম (সালাম আল্লাহ তাআলার সিফাতী নাম) তোমাদের উপর শান্তি প্রেরণ করেন। কিন্তু যেসব ঘরে মদ্যপায়ী ও শূকরখোর কিংবা কোন শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া আপন আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী থাকে ওই সব ঘরে এসব ফিরিশতা প্রবেশ করেন না। (তাফসীরে সাভী, খন্ড ৬ষ্ঠ, পৃষ্ঠা ২৪০১)
অন্য এক বর্ণনায় এটাও এসেছে যে, এসব ফিরিশতার সংখ্যা পৃথিবীর কঙ্কর অপেক্ষাও বেশী হয়ে থাকে। এরা সবাই শান্তি ও রহমত নিয়ে অবতীর্ণ হয়। (তাফসীরে দুররে মনসুর, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ৫৭৯)

সবুজ পতাকা

অন্য এক দীর্ঘ হাদিস, যা হযরত সায়্যিদুনা আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُمْا  বর্ণনা করেছেন, তাজেদারে মদীনা সুরুরে কলবো সীনা হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর মহান ফরমান, যখন শবে ক্বদর আসে তখন আল্লাহ তাআলার নির্দেশে হযরত জিব্রাঈল  عَلَيْهِ السَّلَام একটা সবুজ ঝান্ডা নিয়ে ফিরিশতাদের খুব বড় দল সহকারে পৃথিবীতে অবতরণ করেন। আর ওই সবুজ ঝান্ডাকে কাবা শরীফের উপর উড়িয়ে দেয়। হযরত জিব্রাঈল  عَلَيْهِ السَّلَام এর ১০০ পাখা আছে। সেগুলো থেকে শুধু দুটি পাখা এ রাতে খুলে থাকে। ওই পাখা দুটি পূর্ব ও পশ্চিম সহ সব প্রান্তে বিস্তৃত হয়ে যায়। তারপর হযরত জিব্রাঈল عَلَيْهِ السَّلَام  ফিরিশতাদেরকে নির্দেশ দেন। যে কোন মুসলমান আজ রাতে জাগ্রত থেকে নামায কিংবা আল্লাহ তাআলার যিকরে মশগুল থাকে, তাকে সালাম করো, তার সাথে মোসাফাহা করো। তাছাড়া তাদের দু‘আয় যেনো আমীনও বলে। সুতরাং ভোর পর্যন্ত এ ধারাবাহিকতা চালু থাকে। ভোর হতেই হযরত সায়্যিদুনা জিব্রাঈল عَلَيْهِ السَّلَام ফিরিশতাদেরকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ফিরিশতাগণ আরয করেন, “হে জিব্রাঈল عَلَيْهِ السَّلَام আল্লাহ তাআলা আপনা হাবীব, আহমদে মুখতার হযরত মুহাম্মদ  এর উম্মতের চাহিদাগুলো সম্পর্কে কি করলেন?” হযরত জিব্রাঈল عَلَيْهِ السَّلَام  বলেন, আল্লাহ তাদের উপর বিশেষ দয়ার দৃষ্টি করেন। আর চার ধরণের লোকদের ব্যতীত সমস্ত লোককে ক্ষমা করে দেন। সাহাবা ই কেরাম رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُمْ আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল ﷺ ওই চার ধরণের লোক কারা? ইরশাদ ফরমালেন, ‘১. মদ্যপানে অভ্যস্থ ব্যক্তি, ২. মাতাপিতার অবাধ্য, ৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী এবং ৪. ওইসব লোক যারা পরস্পর হিংসা বিদ্বেষ পোষণ করে ও পরস্পর সম্পর্ক ছিন্ন করে। (শু’আবুল ঈমান, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৩৬, হাদিস নং ৩৬৯৫)

হতভাগা লোক

প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! আপনারা শুনলেন তো! শবে ক্বদর কি পরিমাণ সম্মানিত রাত। এ রাতে প্রতিটি বিশেষ ও সাধারণ লোককে ক্ষমা করে দেয়া হয়। তা সত্ত্বেও মদ্যপানে অভ্যস্ত, মাতাপিতার অবাধ্য, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, পরস্পর কোন শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া হিংসা পোষণকারী আর এ কারণে পরস্পর সম্পর্ক ছিন্নকারীকে এ সাধারণ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত করে দেয়া হয়।

তওবা করে নাও!

প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলার আজাবকে ভয় করার জন্য কি একথা যথেষ্ট নয়। যে শবে ক্বদরের মতো বরকতময় রাতেও যেসব অপরাধীকে ক্ষমা করা হচ্ছে না, তারা কি পরিমাণ জঘণ্য অপরাধী হবে? অবশ্য যদি এসব গুনাহ্ থেকে সত্য অন্তরে তওবা করে নেয়া হয়, আর বান্দার হক সমূহের বিষয়গুলো নিস্পত্তি করে নেয়া হয়, তবে আল্লাহ তাআলার দয়া ও রহমত অসীম ও অশেষ।

লড়াই এর কুফল

হযরত সায়্যিদুনা ওবাদা ইবনে সামিত رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ থেকে বর্ণিত, প্রিয় মক্বী-মাদানী আকা হযরত মুহাম্মদ বাইরে তাশরীফ নিয়ে আসলেন যাতে আমাদেরকে শবে ক্বদর সম্পর্কে বলবেন (যে, তা কোন রাত?) দু’জন মুসলমান পরস্পর ঝগড়া করছিলো। হুযুর ﷺ ইরশাদ করলেন, আমি এজন্য এসেছিলাম যে, তোমাদেরকে শবে ক্বদর সম্পর্কে বলবো। কিন্তু অমুক ব্যক্তি ঝগড়া করছিলো। এ কারণে সেটার নির্দিষ্টকরণ তুলে নেয়া হয়েছে। আর হতে পারে এতে মঙ্গল থাকবে। এখন শবে ক্বদরকে (শেষ দশদিনের) (২৯তম), (২৭তম), (২৫তম) রাতে তালাশ করো। (সহীহ বুখারী, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৬৬৩, হাদিস নং ২০২৩)

যাদুকরও ব্যর্থ

হযরত সায়্যিদুনা ইসমাঈল হক্কী  رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ  বর্ণনা করেন, “এটা নিরাপত্তাময়ী রাত। অর্থাৎ এতে অনেক কিছু থেকে নিরাপত্তা পাওয়া যায়। এ রাতে রোগ শোক, অনিষ্ট এবং বিপদাপদ থেকেও নিরাপত্তা রয়েছে। অনুরূপভাবে, ঝড় ও বিজলী ইত্যাদি, এমন জিনিস, যেগুলোর কারণে ভয় সৃষ্টি হয়, সেগুলোকে থেকেও নিরাপত্তা থাকে, বরং এ রাতে যা কিছু নাযিল হয়, তাতে শান্তি লাভ ও কল্যাণ থাকে। না তাতে শয়তানের অনিষ্ট করার কোন ক্ষমতা থাকে, না তাতে যাদুকরের যাদু চলে। ব্যাস! এ রাতে শান্তিই শান্তি। (রুহুল বয়ান, খন্ড ১০, পৃষ্ঠা ৪৮৫)

শবে কদরের চিহ্নাদি

হযরত সায়্যিদুনা ওবাদাহ ইবনে সামিত  رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ  সারকারে আলী ওয়াকার মাদানী তাজেদার, নবী ই মুখতার হযরত মুহাম্মদ এর বরকতময় দরবারে শবে ক্বদর সম্পর্কে প্রশড়ব করলেন, তখন হযরত মুহাম্মদ ইরশাদ করলেন, শবে ক্বদর রমযানুল মুবারকের শেষ দশদিনের মধ্যে বিজোড় রাতগুলোতে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ কিংবা ২৯ শে রমযান রাতে হয়ে থাকে। তাই যে কেউ ঈমান সহকারে সাওয়াবের নিয়্যতে এ রাতগুলোতে ইবাদত করে, তার বিগত সমস্ত গুনাহ্ ক্ষমা করে দেয়া হয়। সেটা বুঝার জন্য এটাও রয়েছে যে, ওই মুবারক রাত খোলাখুলি, সুষ্পষ্ট এবং পরিস্কার ও স্বচ্ছ থাকবে। এতে না বেশি গরম থাকে, না বেশি ঠান্ডা, বরং এ রাত মাঝারী ধরণের হয়ে থাকে। এমন মনে হয় যেনো তাতে চাঁদ খোলাখুলি ভাবে উদিত। এ পূর্ণ রাতে শয়তানদেরকে আসমানের তারা ছুঁড়ে মারা হয়। আরো নিদর্শনাদির মধ্যে এও রয়েছে যে, এ রাত অতিবাহিত হবার পর যেই ভোর আসে, তাতে সূর্য আলোকরশ্মি ছাড়াই উদিত হয়, আর তা এমন হয় যেনো চৌদ্দ তারিখের চাঁদ।
اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ عَزَّوَجَلّ ওই দিন সূর্যোদয়ের সাথে শয়তানকে বের হতে দেয়া হয়না। (এ দিন ব্যতীত অন্যান্য প্রত্যেক দিনে সূর্যের সাথে সাথে শয়তানও বের হয়ে পড়ে) (মুসনাদে ইমাম আহমদ, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ৪১৪, হাদিস নং ২২৮২৯)

সমুদ্রের পানি মিষ্ট হয়ে যায়

প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! হাদিসে পাকে বর্ণিত রয়েছে, রমযানুল মুবারকের শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতগুলো কিংবা শেষ রাত, চাই তা ত্রিশতম রাতই হোক, এ রাতগুলোর মধ্যে যে কোন একটি রাত শবে ক্বদর। এ রাতকে গোপন রাখার মধ্যে হাজারো হিকমত রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে নিশ্চয় একটি এও যে, মুসলমান প্রতিটি রাত এ রাতের খোঁজে আল্লাহ তাআলার ইবাদতের মধ্যে এ ভেবে অতিবাহিত করার চেষ্টা করবে, জানিনা কোন রাত শবে ক্বদর হয়ে যায়। এ হাদিসে পাকে শবে ক্বদরের কিছু আলামতও ইরশাদ করা হয়েছে। এ চিহ্নগুলো ছাড়াও অন্যান্য বর্ণনায় শবে ক্বদরের আরো আলামত বর্ণিত হয়েছে। এ আলামত বুঝা সবার জন্য সম্ভব নয়, বরং এটা শুধু অন্তর দৃষ্টিসম্পন্নরাই বুঝতে পারেন।
আল্লাহ তাআলা আপন বিশেষ বান্দাদের উপর সেগুলো প্রকাশ করেন। শবে ক্বদরের একটা চিহ্ন এও রয়েছে যে, এ রাতে সমুদ্রের লোনা পানি মিষ্টি হয়ে যায়। তাছাড়া মানুষ ও জিন ছাড়া সৃষ্টির প্রতিটি বস্তু আল্লাহ তাআলার মহত্ব স্বীকার করে সিজদাবনত হয়ে যায়, কিন্তু এ দৃশ্য সবাই দেখতে পায়না।

ঘটনা

হযরত সায়্যিদুনা ওবাইদ ইবনে ইমরান رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ বলেন, “আমি এক রাতে লোহিত সাগরের তীরে ছিলাম। আর ওই লোনা পানি দিয়ে ওযু করছিলাম। যখন আমি ওই পানি স্বাদ গ্রহণ করলাম তখন ওই পানিকে মধুর চেয়েও মিষ্টি পেলাম। আমি সীমাহীন আশ্চর্যান্বিত হলাম। আমি যখন সায়্যিদুনা ওসমান গনী رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ এর নিকট এ ঘটনা বর্ণনা করলাম, তখন তিনি বললেন, “হে ওবায়দা رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ ! সেটা শবে ক্বদর হবে। তিনি আরো বললেন যে, "যে ব্যক্তি এই রাতে আল্লাহ তাআলার স্বরণের মধ্যে অতিবাহিত করে সে যেনো হাজার মাস থেকে বেশী সময় ইবাদত করলো। আর আল্লাহ তাআলা তার সমস্ত গুনাহ্ ক্ষমা করে দেবেন।” (তাযকিরাতুল ওয়া’ইযীন, ৬২৬ পৃষ্ঠা)
আল্লাহ তাআলার রহমত তাঁর উপর বর্ষিত হোক এবং তাঁর সদকায় আমাদের ক্ষমা হোক।


ঘটনা

হযরত সায়্যিদুনা ওসমান ইবনে আবিল আস رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ এর গোলাম তাঁর নিকট আরয করলেন, “হে আমার মুনিব! নৌকা চালাতে চালাতে আমার জীবনের একটা অংশ অতিবাহিত হয়েছে। আমি সমুদ্রের পানিতে একটা অবাক বিষয় অনুভব করেছি, যা আমার বিবেক মেনে নিতে অস্বীকার করছে।“ তিনি বললেন, “ওই আশ্চর্যজনক বিষয় কি?” আরয করলো, “হে আমার মুনিব! প্রতি বছর একটা এমন রাতও আসে, যাতে সমুদ্রের পানি মিষ্টি হয়ে যায়।” তিনি
গোলামকে বললেন, “এবার খেয়াল করো। যখনই পানি মিষ্ট হয়ে যায়, তখনই জানাবে।” যখন রমাযানের ২৭ তম রাত আসলো, তখন গোলাম মুনিবের দরবারে আরয করলো, “মুনিব! আজ সমুদ্রের পানি মিষ্টি হয়ে গেছে।”
(রুহুল বয়ান, খন্ড ১০ম, পৃষ্ঠা ৪৮১)
আল্লাহ তাআলার রহমত তাঁর উপর বর্ষিত হোক এবং তাঁর সদকায় আমাদের গুনাহ্ ক্ষমা হোক।

আমরা চিহ্নগুলো কেন দেখিনা?

প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! শবে ক্বদরের বিভিন্ন চিহ্ন পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। আমাদের হৃদয়ে এ প্রশ্ন জাগতে পারে যে, আমাদের জীবনের অনেক সংখ্যক বছর অতিবাহিত হয়েছে। প্রতি বছর শবে ক্বদর আসতে থাকে। তবু এর কারণ কি যে, আমরা কখনো সেটার চিহ্নগুলো দেখতে পেলাম না? এর জবাবে ওলামা-ই-কেরাম বলেন, “এসব বিষয়ের জ্ঞান প্রত্যেকের থাকে না। কেননা, সেগুলোর সম্পর্ক কাশফ ও কারামাতের সাথে। তাতো সেই দেখতে পারে, যে অন্তদৃষ্টির মতো নে’মত লাভ করেছে যে সব সময় আল্লাহর নির্দেশ অমান্যের অমঙ্গলের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে এমন পাপী লোক এসব দৃশ্য কিভাবে দেখতে পাবে?

বিজোড় রাতগুলোতে তালাশ করো

প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! আল্লাহ তাআলার নিজ ইচ্ছায় শবে ক্বদর কে গোপন রেখেছেন। সুতরাং আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারিনা কোন রাত শবে ক্বদর? উম্মুল মু’মিনীন হযরত সায়্যিদুনা আয়েশা সিদ্দিকা رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهَا বলেন,
“আমার মাথার মুকুট মি’রাজের দুলহা হযরত মুহাম্মদ  ইরশাদ করেছেন, “শবে ক্বদরকে রমাযানুল মুবারকের শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতগুলোতে, অর্থাৎ একুশ, তেইশ, পঁচিশ, সাতাইশ ও ঊনত্রিশ তম রাতে খোজ করো।” (সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৬৬২, হাদিস নং ২০২০)

শেষ সাত রাতে তালাশ করো

হযরত সায়্যিদুনা আবদুল্লাহ ইবনে ওমর رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُمْا বর্ণনা করেন, “সাহিবে কোরআন, হযরত মুহাম্মদ ﷺ 
এর সাহাবায়ে কিরাম رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُمْ থেকে কয়েকজন সাহাবীকে শেষ সাত রাতে শবে কদর দেখানো হয়েছে।
প্রিয় নবী ﷺ  ইরশাদ ফরমায়েছেন, “আমি দেখছি, তোমাদের স্বপ্ন আখেরী সাত রাতে এক ধরণের হয়ে গেছে।একারণে এটার তালাশকারী যেনো সেটাকে আখেরী সাত রাতে তালাশ করে।” (সহীহ বোখারী শরীফ, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৬৬০, হাদিস নং ২০১৫)

শবে ক্বদর গোপন কেন?

প্রিয় প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! আল্লাহ তাআলার পবিত্র নিয়ম হচ্ছে- তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে নিজ ইচ্ছায় বান্দাদের নিকট থেকে গোপন রেখেছেন। যেমন, বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলা নিজের সন্তুষ্টিকে নেক কাজের মধ্যে, নিজের অসন্তুষ্টিকে গুনাহর কাজের মধ্যে এবং আপন ওলীগণকে তাঁর বান্দাদের মধ্যে গোপন রেখেছেন। এর মূল কারণ হচ্ছে- বান্দা যেনো কোন নেক কাজকে ছোট মনে করে ছেড়ে না দেয়। কেননা, সে জানে না যে, আল্লাহ তাআলা কোন নেকীর উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান। হতে পারে, নেকী বাহ্যিকভাবে অতি নগণ্য দেখা যাচ্ছে, কিন্তু সেটা দ্বারা আল্লাহ তাআলা সস্তুষ্ট  হয়ে যান। অনেক হাদিস শরীফ থেকে একথাই জানা যায়। যেমন, কিয়ামতের দিনে এক পাপী নারীকে শুধু এ নেকীর প্রতিদান হিসেবে ক্ষমা করে দেয়া হবে যে, সে এক পিপাসার্ত কুকুরকে দুনিয়ায় পানি পান করিয়েছিলো। অনুরূপভাবে, নিজের অসন্তুষ্টিকে পাপের মধ্যে গোপন রাখার রহস্য হচ্ছে- বান্দা যেনো কোন গুনাহকে ছোট মনে করে সম্পন্ন করে না বসে, বরং প্রতিটি গুনাহ থেকে বাঁচতে থাকে। যেহেতু বান্দা জানে না যে, আল্লাহ তাআলা কোন্ গুনাহর কারণে নারায হয়ে যাবেন? সুতরাং সে প্রতিটি গুনাহ থেকে বিরতই থাকবে। অনুরূপভাবে, আউলিয়া কেরাম رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِمْ কে বান্দাদের মধ্যে এজন্য গোপন রেখেছেন যেন মানুষ প্রতিটি নেক মুসলমানের প্রতি যত্নবান হয়, সম্মান বজায় রাখে, আর একথা চিন্তা করে যে, হতে পারেন উনি আল্লাহ তাআলার ওলী। আর প্রকাশ থাকে যে, যখন আমরা নেক লোকদের প্রতি সম্মান করতে শিখে যাবো, মন্দ ধারণার অভ্যাস পরিহার করবো, সমস্ত মুসলমানকে নিজের চেয়ে ভালো মনে করতে থাকবো, তখন আমাদের সমাজও সংশোধন হয়ে যাবে। আর اِنْ شَاءَ الله عَزَّوَجَلّ আমাদের শেষ পরিণতিও ভাল হবে।

হিকমতসমূহের মাদানী ফুল

ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ তার প্রসিদ্ধ তাফসীর ‘তাফসীরে কবীর’ এর মধ্যে লিখেছেন, আল্লাহ তাআলা শবে ক্বদরকে কয়েকটি কারণে গোপন রেখেছেন।
প্রথমতঃ যেভাবে অন্যান্য জিনিসকে গোপন রেখেছেন, যেমন আল্লাহ তাআলা নিজের সন্তুষ্টিকে আনুগত্যপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে গোপন রেখেছেন, যাতে বান্দা প্রতিটি আনুগত্যের প্রতি উৎসাহিত হয়, নিজের অসন্তুষ্টিকে গুনাহের কাজগুলোর মধ্যে গোপন রেখেছেন, যাতে প্রতিটি গুনাহ্ থেকে বিরত থাকে, আপন ওলীগণকে তাঁর বান্দাদের মধ্যে গোপন রেখেছেন, যাতে লোকেরা সবার প্রতি সম্মান দেখায়, দু’আ কবূল হওয়াকে দু’আ গুলোর মধ্যে গোপন রেখেছেন, যাতে সব ধরণের দু’আ খুব বেশি পরিমাণে করে, ইসমে আজমকে নাম সমূহের মধ্যে গোপন রেখেছেন, যাতে সব ধরনের নাম মোবারকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। ‘সালাতে ওসত্বা’ (মধ্যবর্তী নামায) কে নামাযগুলোর মধ্যে গোপন
করেছেন, যাতে নামাযগুলোর প্রতি যত্নবান হয়, তওবা কবুল হওয়াকে গোপন রেখেছেন, যাতে বান্দা প্রত্যেক প্রকারের তওবা সর্বদা করতে থাকে, মৃত্যুর সময়কে গোপন রেখেছেন, যাতে (শরীয়তের বিধানাবলী বর্তায় এমন) বিষয় বান্দা ভয় করতে থাকে। অনুরূপভাবে, শবে ক্বদরকে গোপন রেখেছেন, যাতে রমযানের সমস্ত রাতের প্রতি সম্মান দেখায়।

দ্বিতীয়ত: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করছেন, “যদি আমি শবে ক্বদরকে নির্দিষ্ট করে দিতাম, অথচ আমি তোমাদের গুনাহর কথাও জানি, তবে যদি কখনো যৌন তাড়না তোমাকে এ রাতে গুনাহের নিকটে নিয়ে ছেড়ে দিতো, তবে গুনাহে লিপ্ত হয়ে যেতে। আর তোমার এ রাত সম্পর্কে জানা থাকা সত্ত্বেও গুনাহ্ করে নেয়া, না জেনে গুনাহ্ করার চেয়ে বেশী জঘন্য হয়ে যেতো। সুতরাং এ কারণে আমি সেটাকে গোপন রেখেছি। বর্ণিত আছে যে, মাদিনার তাজেদার, উভয় জগতের সরদার, হযরত মুহাম্মদ  মসজিদ শরীফে তাশরীফ আনলেন। দেখলেন এক ব্যক্তি ঘুমিয়ে আছে। তখন ইরশাদ ফরমালেন, হে আলী رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ তাকে জাগাও, যাতে ওযু করে নেয়। হযরত আলী رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ  তাকে জাগালেন। তারপর আরয করলেন, “হে আল্লাহর রসূল! ﷺ আপনিতো নেক্ কাজের প্রতি সর্বাপেক্ষা বেশি আগ্রহী ও তৎপর। আপনি (নিজে) কেন তাকে জাগালেন না? ইরশাদ ফরমালেন, এজন্য যে, সে তোমার কথা মানতে অস্বীকার করলে তা কুফরী হবে না, কিন্তু আমার আহ্বানে সাড়া দিতে অস্বীকার করলে তা কুফর হয়ে যেতো সুতরাং আমি তার পাপের বোঝা হালকা করার জন্য এমন করেছি।”
সুতরাং যখন মাদিনার তাজেদার, উভয় জগতের সরদার, রহমতের রসূল ﷺ এর এমন অবস্থা তখন এটার উপর মহান প্রতিপালকের রহমত বা দয়ার অনুমান করো, তা কেমন হবে? আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করছেন- “যদি তুমি শবে ক্বদর সম্পর্কে জানতে এবং তাতে ইবাদত করতে, তবে হাজার মাস থেকে বেশি সাওয়াব অর্জন করতে। আর যদি তাতে গুনাহ্ করে বসতে, তবে হাজার মাসের চেয়েও বেশী শাস্তি পেতে। শাস্তি দূর করা সাওয়াব উপার্জন করার চেয়ে উত্তম।

তৃতীয়তঃ আমি এ রাতকে গোপন রেখেছি, বান্দা যাতে সেটার তালাশ করতে গিয়ে পরিশ্রম করে। আর এ পরিশ্রমের সাওয়াব অর্জন করে।

চতুর্থত: যখন বান্দার মনে শবে ক্বদর কোনটি সে সম্পর্কে নিশ্চিত বিশ্বাস হবেনা, তবে রমাযানুল মুবারকের প্রতিটি রাতে আল্লাহ তাআলার বন্দেগীতে থাকবে- এ আশায় যে, এ রাতটিই শবে ক্বদর হতে পারে। এদের সম্পর্কেও তো আল্লাহ তাআলা ফিরিশতাদেরকে এ কথা বলবে, তোমরাই তো এ (মানব জাতি) সম্পর্কে বলেছিলে, “তারা ঝগড়া করবে, রক্তপাত করবে।” অথচ এরাতো এ ধারণাকৃত রাতে পরিশ্রম করে যাচ্ছে। যদি আমি তাকে এ রাতের জ্ঞান দিয়ে দিতাম, তবে কেমন হতো। তাই এখানে আল্লাহ তাআলা এর ওই বানীর রহস্য প্রকাশ পেয়েছে, যা তিনি ফিরিশতাদের জবাবে ইরশাদ করেছিলেন, যখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ইরশাদ করেছেন,
 اِنِّیۡ جَاعِلٌ فِی الۡاَرۡضِ خَلِیۡفَۃً ؕ
কানযুল ঈমান থেকে অনুবাদ: আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি নিয়োগকারী। (পারা ১, সূরা বাকারা, আয়াত ৩০)

তখন ফিরিশতাগণ আরয করল
قَالُوۡۤا اَتَجۡعَلُ فِیۡہَا مَنۡ یُّفۡسِدُ فِیۡہَا وَ یَسۡفِکُ الدِّمَآءَ ۚ وَ نَحۡنُ نُسَبِّحُ بِحَمۡدِکَ وَ نُقَدِّسُ لَکَ
কানযুল ঈমান থেকে অনুবাদ: তারা বললো, এমন কাউকে কি প্রতিনিধি করবেন, যে তাতে ফ্যাসাদ ছড়াবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? আর আমরা আপনার প্রশংসা সহকারে আপনার স্তুতিগান করি এবং আপনারই প্রশংসা ঘোষণা করি। (পারা ১, সূরা বাকারা, আয়াত ৩০)

তাই ইরশাদ করলেন
قَالَ اِنِّیۡۤ اَعۡلَمُ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ ﴿۳۰﴾ 
কানযুল ঈমান থেকে অনুবাদ: বলেন, আমি যা জানি তা তোমরা জানোনা। (পারা ১, সূরা বাকারা, আয়াত ৩০)
সুতরাং আজ এ মহান বাণীর রহস্য প্রকাশ পেলো। (তাফসীরে কবীর, ১১শ খন্ড, পৃষ্ঠা ২২৯)

বছরের যে কোন রাত শবে ক্বদর হতে পারে

অতএব অগণিত উপকারের ভিত্তিতে শবে ক্বদরকে গোপন রাখা হয়েছে, যাতে আল্লাহ তাআলার নেক বান্দাগন এর তালাশে গোটা বছরই লেগে থাকে। অনুরূপভাবে তারা সাওয়াব অর্জনের চেষ্টার মধ্যে লেগে থাকে। শবে ক্বদরের নির্দিষ্টকরণের ক্ষেত্রে সম্মানিত আলিমগণ رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِمْ এর বহু মতভেদ দেখা যায়।
কিছু সংখ্যক বুযুর্গ  رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِمْ এর মতে শবে ক্বদর পুরো বছর ঘুরে থাকে। যেমন, হযরত সায়্যিদুনা আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ  رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ  বলেন, শবে ক্বদর ওই ব্যক্তিই পেতে পারে, যে গোটা বছরই রাতের বেলায় ইবাদত করে। এ অভিমতকে সমর্থন করে ইমামূল আরিফীন সায়্যিদুনা শায়খ মুহী উদ্দীন ইবনুল আরবী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ  বলেন, “আমি শা’বানুল মু’আয্যমের ১৫ তম রাত (অর্থাৎ শবে বরাত) অন্য একবার শা’বানুল মু’আয্যমের ১৯ তম রাতে শবে ক্বদর পেয়েছি। তাছাড়া রমযানুল মুবারকের ১৩ তম রাত এবং ১৮তম রাতেও দেখেছি। আর রমযানুল মুবারকের শেষ দশদিনের বিজোড় রাতগুলোতে দেখেছি। তিনি আরো বলেন, যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শবে ক্বদর রমযানুল মুবারকের মধ্যেই পাওয়া যায়, তবুও আমার অভিজ্ঞতাতো এটাই যে, এটা পূর্ণ বছরই ঘুরতে থাকে, অর্থাৎ প্রত্যেক বছর নির্দিষ্ট এক রাতে শবে ক্বদর হয়না।

ইমাম আজম رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ এর দু’টি অভিমত

হযরত সায়্যিদুনা ইমাম আযম আবূ হানিফা  رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ  থেকে এ প্রসঙ্গে দু’টি অভিমত বর্ণিত হয়েছে,
১. শবে ক্বদর রমযানুল মুবারকেই রয়েছে। কিন্তু কোন রাতটি তা নির্ধারিত নয়। সায়্যিদুনা ইমাম আবূ ইউসুফ ও সায়্যিদুনা ইমাম মুহাম্মদ  رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِمْ এর মতে, রমাযানুল মুবারকের শেষ পনের রাতের মধ্যে শবে ক্বদর হয়।
২. সায়্যিদুনা ইমাম আবূ হানিফা رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ  এর এক প্রসিদ্ধ অভিমত হচ্ছে: শবে ক্বদর পুরো বছরই ঘুরতে থাকে, কখনো মাহে রমযানুল মুবারকে হয়, কখনো অন্যান্য মাসে।
এ অভিমত সায়্যিদুনা আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, সায়্যিদুনা আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ ও সায়্যিদুনা ইকরামা رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُمْا থেকেও বর্ণিত। (ওমদাতুল কারী, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৫৩, হাদীস নং ২০১৫)
সায়্যিদুনা ইমাম শাফেয়ী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ  এর মতে, শবে ক্বদর রমযানুল মুবারকের শেষ দশ দিনে রয়েছে আর তার দিনটি নির্দিষ্ট। এতে কিয়ামত পর্যন্ত কোন পরিবর্তন হবে না। (ওমদাতুল কারী, খন্ড-৮ম, পৃ ২৫৩, হাদীস নং ২০১৫)

শবে ক্বদর পরিবর্তন হয়

সায়্যিদুনা ইমাম মালিক ও সায়্যিদুনা ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ  এর মতে, শবে ক্বদর রমযানুল মুবারকের আখেরী দশদিনের বিজোড় রাতগুলোর মধ্যে হয়। কিন্তু এর জন্য কোন একটি রাত নির্ধারিত নেই। প্রতি বছর এ বিজোড় রাতগুলোর মধ্যে ঘুরতে থাকে। অর্থাৎ: কখনো ২১শে, কখনো ২৩শে, কখনো ২৫শে, কখনো ২৭ শে এবং কখনো ২৯ শে রমযানুল মুবারকের রাতে শবে ক্বদর হয়। (তাফসীরে সাভী, খন্ড ৬ষ্ঠ, পৃষ্ঠা ২৪০০)

আবুল হাসান ইরাকী এবং শবে ক্বদর

কিছু সংখ্যক বুযুর্গ হযরত সায়্যিদুনা শায়খ আবুল হাসান ইরাকী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ এর বাণী বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি যখন থেকে বালেগ হয়েছি, তখন থেকে, اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ عَزَّوَجَلّ  আমি শবে ক্বদর দেখিনি এমন কখনো হয়নি। তারপর আপন অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন, “কখনো যদি রবিবার কিংবা বুধবার ১লা রমযান হতো, তবে ২৯ তম রাত্রি, যদি সোমবার ১লা রমযান হতো, তবে ২১শে রাত, ১ম রোযা মঙ্গল কিংবা জুমুআর দিন হলে ২৭ শে রাত, ১লা রমযান বৃহস্পতিবার হলে ২৫শে রাত এবং ১ম রমযান শনিবার হলে ২৩ শে রাত্রি শবে ক্বদর পেয়েছি। (নুযহাতুল মাজালিস, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ২২৩)

২৭শে রাত শবে ক্বদর

যদিও বুযুর্গানে দ্বীন এবং মুফাসিসরগণ ও মুহাদ্দিসগণ رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِمْ শবে ক্বদর নির্ণয়ের ক্ষেত্রে মতবিরোধ রয়েছে, তবুও প্রায় সবার অভিমত হচ্ছে, প্রতি বছর শবে ক্বদর ২৭ শে রমযানুল মুবারকের রাতেই হয়ে থাকে। হযরত সায়্যিদুনা উবাই ইবনে কা’ব رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ  ২৭ শে রমযানুল মুবারকের রাতকেই শবে ক্বদর বলেন। (তাফসীর-ই-সাভী, খন্ড ৬ষ্ঠ, পৃষ্ঠা ২৪০০)
হুযুর গাউসে আযম সায়্যিদুনা শায়খ আবদুল কাদির জিলানী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ  ও উপরোক্ত অভিমত ব্যক্ত করেছেন। হযরত সায়্যিদুনা আবদুল্লাহ ইবনে ওমর رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُمْا  ও এ কথাই বলেছেন।

হযরত সায়্যিদুনা শাহ আবদুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ  বলেন, “শবে ক্বদর রমযান শরীফের ২৭তম রাতে হয়ে থাকে। নিজের কথার সমর্থনে তিনি দুটি দলীল বর্ণনা করেন, ১. লাইলাতুল ক্বদর শব্দ দুটিতে ৯ টা বর্ণ রয়েছে। এ কলেমা সূরা ক্বদরে তিনবার ইরশাদ হয়েছে। এভাবে ‘তিনকে নয় দিয়ে গুণ করলে গুণফল হয় ২৭। এটা এ কথার দিকে ইঙ্গিত বহন করেছে যে, শবে ক্বদর ২৭শে রমযানুল মুবারকে হয়ে থাকে। ২. অপর ব্যাখ্যা এটা বলেন যে, এ সুরা মুবারকায় ত্রিশটি পদ রয়েছে। তন্মধ্যে ২৭তম বর্ণ হচ্ছে, আরবী পদটি, যা দ্বারা ‘লাইলাতুল কদর’ বুঝানো হয়। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে নেক্কার লোকদের জন্য এ ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে, রমযান শরীফের ২৭শে রাতই শবে ক্বদর হয়। (তাফসীরে আযীযী, খন্ড-৪র্থ, পৃ-৪৩৭)
প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! আল্লাহ তাআলা শবে ক্বদরকে গোপন রেখে যেনো আপন বান্দাদেরকে প্রতিটি রাতে কিছু না কিছু ইবাদত করার প্রতি উৎসাহ দান করেছেন। যদি তিনি শবে ক্বদরের জন্য কোন একটি রাতকে নির্ধারণ করে দিয়ে সুস্পষ্টভাবে সেটার জ্ঞান আমাদেরকে দিয়ে দিতেন, তবে আবার একথার সম্ভাবনা থাকতো যে, আমরা বছরের অন্যান্য রাতের ক্ষেত্রে উদাসীন হয়ে যেতাম, শুধু ওই এক রাতের প্রতি গুরুত্ব দিতাম। এখন যেহেতু সেটাকে গোপন রাখা হয়েছে, সেহেতু বুদ্ধিমান হচ্ছে সে-ই, যে গোটা বছর ওই মহান রাতের তালাশে থাকে, ‘জানিনা কোন রাতটি শবে ক্বদর।’ বাস্তবিকপক্ষে যদি কেউ সত্য অন্তরে সেটা সারা বছরই তালাশ করে তবে আল্লাহ তাআলা কারো পরিশ্রমকে নষ্ট করেন না। তিনি অবশ্যই আপন অনুগ্রহ ও বদান্যতায় তাকে ওই রাতের সৌভাগ্য দান করবেন।

প্রতিরাত ইবাদতে অতিবাহিত করার সহজ ব্যবস্থাপনা

“গারা-ইবুল কুরআন” ১৮৭ পৃষ্ঠায় একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি রাতে এ দু‘আ তিনবার পড়ে নেবে সে যেনো শবে ক্বদর পেয়ে গেছে।
তাই প্রতি রাতে এ দু‘আ পড়ে নেয়া চাই:
235
অর্থাৎ: সহনশীল দয়ালু আল্লাহ ব্যতীত ইবাদতের উপযোগী কেউ নেই। আল্লাহ তাআলা পবিত্র, যিনি সপ্ত আসমান ও আরশে আযীমের মালিক ও প্রতিপালক।
আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি প্রার্থীরা! সম্ভব হলে সারা বছরই প্রত্যেক রাতে কিছু না কিছু পূণ্যময় কাজ অবশ্যই করে নেয়া চাই। কারণ, জানি না কখন শবে কদর হয়ে যায়। প্রতিটি রাতে দুটি ফরয নামায আসে মাগরিব ও ইশা। কমপক্ষে এ উভয় নামাযের জামাআতের প্রতি খুবই গুরুত্ব দেয়া চাই। কারণ, শবে ক্বদরে যদি ওই দু’ ওয়াক্ত নামাযের জামা‘আত ভাগ্যে জুটে যায়, তবে اِنْ شَاءَ الله عَزَّوَجَلّ  আমাদের নৌকা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাবে, বরং প্রতিদিনই ইশা ও ফজরের নামাযের জমাআতের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার অভ্যাস গড়ে নিন।
তাজেদারে মদীনা সুরুরে কলবো সীনা হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর মহান ইরশাদ হচ্ছে, “যে ব্যক্তি এশার নামায জামাআত সহকারে পড়েছে, সে যেনো অর্ধ রাত জাগ্রত থেকে ইবাদত করেছে। যে ব্যক্তি ফজরের নামায জামাআত সহকারে আদায় করেছে, সে যেনো পুরো রাতই জাগ্রত থেকে ইবাদত করেছে।” (সহীহ মুসলিম, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৩২৯, হাদিস নং ৬৫৬)
ইমাম জালাল উদ্দীন সুয়ূতী শাফেয়ী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ বর্ণনা করেন, মদীনার তাজেদার হযরত মুহাম্মদ ﷺ ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি এশার নামায জামা’আত সহকারে পড়েছে, নিশ্চয় সে যেনো লাইলাতুল ক্বদর থেকে নিজের অংশ অর্জন করে নিয়েছে। (আল জামিউল সাগীর, পৃষ্ঠা ৫৩২, হাদিস নং ৮৭৯৬)

২৭ তম রাতের প্রতি গুরুত্ব দিন

আল্লাহ তাআলা রহমতের সন্ধানকারীরা! যদি সারা বছরই জামায়াতে নামায পড়ার অভ্যাস গড়ে নেয়া হয়, তবে শবে ক্বদরে এ দু’টি নামাযের জামায়াতের সৌভাগ্যও মিলে যাবে। আর রাতভর শুয়ে থাকা সত্ত্বেও اِنْ شَاءَ الله عَزَّوَجَلّ  প্রতিদিনের মতো শবে ক্বদরেও পুরো রাত ইবাদত করার সাওয়াব পাওয়া যাবে।
236
উচ্চারণ: আগর ক্বদর দানী তো হার শব শবে ক্বদর আস্ত।
অর্থ: মূল্যায়ন করতে জানলে প্রতিটি রাতই শবে ক্বদর।
যেসব রাতে শবে ক্বদর হবার বেশী সম্ভাবনা রয়েছে, যেমন রমযানুল মুবারকের শেষ দশ রাত কিংবা কমপক্ষে সেগুলোর বিজোড় রাতগুলো, ওইগুলোর মধ্যে ইবাদতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া চাই। বিশেষ করে ২৭ তম রাত। শবে ক্বদর সম্পর্কে অধিকতর গ্রহণযোগ্য ধারণা এটাই। এ রাতকে তো অলসতার মধ্যে কাটানো মোটেই উচিত হবে না। ২৭ তম রাত বিশেষ করে তওবা, ইস্তিগফার এবং বারংবার যিকির ও দুরুদ শরীফ পাঠের মধ্যে কাটানো উচিত।

শবে ক্বদরে পড়ুন

আমিরুল মুমিনীন হযরতে মাওলায়ে কাইনাত আলী মুরতাজা শেরে  খোদা رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ  বলেন,“যে কেউ শবে ক্বদরে সূরা ক্বদর সাতবার পড়বে, আল্লাহ তাআলা তাকে প্রত্যেক বালা মুসীবত থেকে নিরাপত্তা দান করেন। আর সত্তর হাজার ফিরিশতা তার জন্য জান্নাত প্রাপ্তির দু’আ করেন। যে ব্যক্তি (সারা বছরে যখনই) জুমার দিন জুমার নামাযের পূর্বে তিনবার সূরা ক্বদর পড়ে আল্লাহ তাআলা ওই দিনে সমস্ত নামায সম্পন্নকারীর সংখ্যার সমান নেকী তার আমল
নামায় দান করেন।” (নূযহাতুল মাজালিস, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ২২৩)

শবে কদরের দু’আ

উম্মুল মু’মিনীন হযরত সায়্যিদাতুনা আয়েশা সিদ্দিকা رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهَا বলেন, আমি আমার মাথার মুকুট, মি’রাজের দুলহা হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর বরকতময় দরবারে আরয করলাম, হে আল্লাহর রসূল ﷺ যদি আমি শবে ক্বদর সম্পর্কে জানতে পারি তবে আমি কি পড়বো? সারকারে আবাদ-করার, শফীয়ে রোযে শুমার হযরত মুহাম্মদ
ইরশাদ করলেন, “এভাবে দু‘আ প্রার্থনা করো:
237
অর্থ:- হে আল্লাহ নিশ্চয় তুমি ক্ষমাশীল। তুমি ক্ষমা পছন্দ করো। তাই  আমাকে ক্ষমা করো। (তিরমিযী, খন্ড ৫ম, পৃষ্ঠা ৩০৬, হাদিস নং ৩৫২৪)
প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! আহা! প্রত্যেক রাতে আমরাও যদি এ দু’আ কমপক্ষে একবার করে পড়ে নিই। তাহলে কখনোতো শবে ক্বদর ভাগ্যে জুটে যাবে। অন্যথায়, কমপক্ষে ২৭ শে রমাযানের রাতে এ দোআ বারবার পড়া উচিত।
এছাড়াও, ২৭ শে রাতে আল্লাহ তাআলা সামর্থ্য দিলে রাত জেগে বেশী পরিমাণে দুরুদ ও সালাম পাঠ করবেন। যিকির ও না'তের মাহফিলে সম্ভব হলে শরীক হবেন। আর নফল ইবাদতের মধ্যে সারারাত কাটানোর চেষ্টা করবেন।

শবে ক্বদরের নফলসমূহ

হযরত সায়্যিদুনা ইসমাঈল হক্কী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ  তাফসীর-ই-রূহুল বয়ান এর মধ্যে এ বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, “যে ব্যক্তি শবে ক্বদরের নিয়্যতে নিষ্ঠা সহকারে নফল পড়বে, তার পূর্বাপর গুনাহ ক্ষমা হয়ে যাবে।” (রূহুল বয়ান, খন্ড ১০ম, পৃষ্ঠা ৪৮০)
হুযুর ﷺ যখন রমযানুল মুবারকের শেষ দশদিন আসতো তখন ইবাদতের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে নিতেন। সেগুলোর মধ্যে রাতে জাগ্রত থাকতেন। নিজ পরিবারের সদস্যদেরকে জাগাতেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, খন্ড ২য়, পৃষ্ঠা ৩৫৭, হাদিস নং ১৭৬৮)
হযরত সায়্যিদুনা ইসমাঈল হককী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ  উদ্ধৃত করেছেন, বুযুর্গানে দ্বীন رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِمْ এ দশ দিনের প্রতিটি রাতে দু’রাকাআত নফল নামায শবে ক্বদরের নিয়্যতে পড়তেন। তাছাড়া কিছু সংখ্যক শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি থেকে
উদ্ধৃত, যে ব্যক্তি প্রত্যেক রাতে দশটি আয়াত এ নিয়্যতে পড়ে নেবে, সে সেটার বরকত ও সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে না। আর ফকীহ্ আবুল লায়্স সমরকন্দী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِمْ বলেন, শবে ক্বদরের নামায কমপক্ষে দু’রাক’আত, বেশীর চেয়ে বেশী ১০০০ রাক’আত। মাঝারী পর্যায়ের হচ্ছে ২০০ রাক’আত। প্রত্যেক রাক’আতে মাঝারী পর্যায়ের কিরাত হচ্ছে সূরা ফাতিহার পর একবার সূরা ক্বদর ও তিনবার সূরা ইখলাস পড়বেন। আর প্রত্যেক দু’রাক’আতের
পর সালাম ফেরাবেন। সালামের পর মাদিনার তাজেদার, উভয় জগতের সরদার, হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর উপর দুরুদ শরীফ পাঠ করবেন।
তারপর নামাযের জন্য দাঁড়িয়ে যাবেন। এভাবে, নিজের শত রাকআত, কিংবা তদপেক্ষা কম বা বেশীর, যে নিয়্যত করেছেন তা পূরণ করবেন। সুতরাং এমনি করা এ শবে ক্বদরের মহা মর্যাদা, যা আল্লাহ তাআলা বর্ণনা করেছেন, আর
যা মাদিনার তাজেদার, উভয় জগতের সরদার, হযরত মুহাম্মদ ﷺ এতে রাত জাগরণের কথা ইরশাদ করেছেন, অতএব এতটুকু যথেষ্ট হবে। (রূহুল বয়ান, ১০ খন্ড, পৃষ্ঠা ৪৮৩)
প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! নিশ্চয় এ রাত বরকতের ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হয়। যেমন হুযূরে আনওয়ার মদীনার তাজদার হযরত মুহাম্মদ ﷺ ইরশাদ করেন, “তোমাদের উপর এমন এক মাস এসেছে, যাতে একটি রাত এমনও আছে, যা হাজার মাস থেকে উত্তম। যে এ রাত থেকে বঞ্চিত রয়েছে, সে পূর্ণ কল্যাণ থেকে বঞ্চিত রয়েছে। (যে শবে ক্বদরের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত রইল, সে আসলেই কল্যাণ থেকে বঞ্চিত রইল।) (মিশকাত, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৭২, হাদিস নং ১৯৬৪)
এমন রহমত ও বরকতসম্পন্ন রাতকে অবহেলায় কাটিয়ে দেয়া বড়ই বঞ্চিত হবার প্রমাণ। তাই সবার জন্য উচিত শবে ক্বদরকে পূর্ণ রমযানুল মুবারকে তালাশ করা। অন্যথায় কমপক্ষে ২৭ শে রাতকে অবশ্যই ইবাদতের মধ্যে অতিবাহিত
করবেন। হে আমাদের প্রিয় আল্লাহ তাআলা আপন প্রিয় হাবীব ﷺ এর ওসীলায় আমরা গুনাহ্গারদেরকে লাইলাতুল ক্বদরকে মূল্যায়ন করার (মর্যাদা ও সম্মান দেয়ার) এবং তাতে বেশীর চেয়ে বেশী পরিমাণে আপনার ইবাদত করার তাওফীক দান করুন।
আমীন বিজাহিন্নাবিয়্যিল আমিন ﷺ 

জাগ্রত অবস্থায় দিদার নসীব হল ........ কার?

প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! তবলীগে কুরআন ও সুন্নাতের বিশ্বব্যাপী অরাজনৈতিক সংগঠন দা’ওয়াতে ইসলামীর সুন্নাতের প্রশিক্ষণের মাদানী কাফিলা সমূহে আশিকানে রসূলগণের সাথে সুনড়বতে ভরপুর সফরে অভ্যস্থ হয়ে যান। اِنْ شَاءَ الله عَزَّوَجَلّ  শবে ক্বদর পাওয়ার সৌভাগ্য হবে। উৎসাহের জন্য আপনাদের খিদমতে  মাদানী কাফিলার একটি সুন্দর সুগন্ধময় মাদানী ফুল উপস্থাপন করছি। যেমনিভাবে নতুন করাচীর এক ইসলামী ভাই এর বয়ানের সারমর্ম ছিল এই রকম, “আমি প্রথমবার ১২ দিনের মাদানী কাফিলায় সফরের সৌভাগ্য অর্জন করলাম। নওয়াব শাহ বাবুল মদীনা করাচীর এক মসজিদে আমাদের মাদানী কাফিলা অবস্থান নিল। নেকীর দিকে আগ্রহ কম হওয়ার কারণে আমার মন
লাগছিল না। একদিন মসজিদের উঠানে রুটিন মোতাবেক সুন্নতে ভরপুর হালকা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল ইতোমধ্যে রোদ আসল।
এক ইসলামী ভাই উঠে মসজিদের ভিতর চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে মসজিদের ভিতর থেকে উচু স্বরে একটি আওয়াজ হল। সকলে সেদিকে দৃষ্টিপাত করল। ইতোমধ্যে সেই ইসলামী ভাই কাঁদতে কাঁদতে বাইরে আসলেন এবং বলতে লাগলেন, এই এক্ষুনি জাগ্রত অবস্থায় আমি সবুজ পাগড়ী বিশিষ্ট উজ্জল চেহারার অধিকারী এক বুযুর্গ ব্যক্তিকে দেখলাম যিনি এইভাবে কিছু বললেন, “আঙ্গিনায় রোদে বসে সুন্নত প্রশিক্ষণার্থীরা বেশি সাওয়াব অর্জন করছে।” এই কথা শুনে মাদানী কাফিলায় অংশগ্রহণকারী সকলেই অশ্র“সিক্ত হয়ে গেল এবং আমিও অত্যন্ত প্রভাবিত হয়ে গেলাম আর আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম যে, এখন থেকে কখনো দা’ওয়াতে ইসলামীর মাদানী পরিবেশ ছাড়ব না। اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ عَزَّوَجَلّ
এখনতো মাদানী কাফিলায় সফর করাটা আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। একবার আমাদের মাদানী কাফিলা মীরপুরখাস (বাবুল মদীনা সিন্দ) এ অবস্থান করছিল। এক আশিকে রসূল বললেন যে, তাহাজ্জুদ নামাযের সময় আমি
দেখলাম কাফিলার সকল ইসলামী ভাইয়ের উপর আলো (নূর) বর্ষণ হচ্ছে। এতে আরো বেশি প্রেরণা পেলাম। اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ عَزَّوَجَلّ এই বয়ান দেয়ার সময় আমি দা’ওয়াতে ইসলামীর মাদানী কাজের মাদানী ইনআমাতের এলাকায়ী যিম্মাদার
হিসেবে মাদানী সুবাস ছড়ানোর সৌভাগ্য অর্জন করছি।

অর্ধেক রোদে বসবেন না

প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! আপনারা শুনলেনতো! দয়ার বৃষ্টি কিভাবে বর্ষিত হচ্ছে! সম্ভবত তা গরমের মওসুম ছিল না এবং সকালের ঠান্ডা ঠান্ডা রোদে দিওয়ানা গণ সুন্নতের প্রশিক্ষণে ব্যস্ত ছিল। তাদের উৎসাহ উদ্দীপনা খুবই মজবুত
ছিল। অন্যথায় বিনা কারণে কঠিন রোদে সুনড়বত শিক্ষার হালকা লাগানো ঠিক নয় যে, এতে একাগ্রতা অর্জন হয় না এবং শিক্ষাতে ভুল বুঝার সম্ভাবনা থাকে। ইলমে দ্বীন বা দ্বীনি শিক্ষা অর্জনের জন্য পরিপূর্ণ মনোরম পরিবেশ হওয়া চাই। শরীরের কোন অংশে যদি রোদ এসে পড়ে, তখন সুন্নত হচ্ছে এই যে, সেখান থেকে সরে বসবে। অর্থাৎ হয়ত পরিপূর্ণ ছায়াতে কিংবা পূর্ণ রোদে চলে যাবে।
যেমন হযরত সায়্যিদুনা আবু হুরাইরা  رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ  থেকে বর্ণিত যে, আল্লাহর প্রিয় হাবীব, হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর এরশাদ হচ্ছে, যখন কোন ব্যক্তি ছায়াতে থাকে আর ছায়া সরে যায়, সে কিছু ছায়াতে আর কিছু রোদে থাকে তাহলে সেখান থেকে উঠে যাবে। (সুনানে আবু দাউদ, খন্ড-৪র্থ, পৃ-৩৩৮, হাদীস নং-৪৮২১)

জান্নাতেও ওলামায়ে কিরামের প্রয়োজন হবে

মদীনার সুলতান, হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর বাণী হচ্ছে,  জান্নাতীরা জান্নাতে ওলামায়ে কিরামের মুখাপেক্ষী হবে, এজন্য যে তারা প্রতি জুমাতে আল্লাহ তা‘আলার দিদার দ্বারা সম্মানিত হবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলবেন,
242
অর্থাৎ “যা খুশি আমার নিকট চাও।” তখন তারা জান্নাতী ওলামায়ে কেরামের দিকে ফিরে বলবেন, আমরা প্রভূর নিকট কি চাইব? তারা বলবেন, এটা চাও, ওটা চাও। যেমনিভাবে ঐ সমস্ত লোকেরা দুনিয়াতে ওলামায়ে কেরামের মুখাপেক্ষী ছিল, জান্নাতেও তাদের মুখাপেক্ষী হবে। (আল ফিরদৌস বেমাসুরীল খিতাব, খন্ড-১ম, পৃ-২৩০, হাদীস নং-৮৮০, আল্লামা সুয়ূতীর জামেউস সগীর, পৃ-১৩৫, হাদীস নং-২২৩৫)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Thanks for supporting.

পোস্ট শ্রেণি

অযু-গোসল-পবিত্রতা (12) আপডেট চলমান (25) আমাদের কথা ও অন্যান্য বিষয়াবলী (6) আমাদের প্রিয় নবী ﷺ (4) আরবি মাস ও ফযীলত (11) ইসলামী ইতিহাস ও শিক্ষনীয় ঘটনা (4) ইসলামী জীবন ও সুন্দর চরিত্র (4) ঈদ-কাযা-জানাযা-তারাবী-নফল ও অন্যান্য নামায (5) উত্তম আমল ও সাওয়াবের কাজ (4) কুরআন-তাফসীর ও হাদিস (16) কুরবানী (6) চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য কথন (14) জিকির-দোআ-দুরূদ ও ফযীলত (8) নবী-সাহাবী ও আওলিয়াদের জীবনী (8) নামায (17) পর্দা ও লজ্জাশীলতা (16) ফয়যানে জুমা (3) বদ আমল ও গুনাহের কাজ (2) মওত-কবর-হাশর ও আযাব (12) মাসআলা-মাসাইল ও প্রশ্নোত্তর (4) মাসাইল (30) যাকাত-ফিতরা ও সদক্বাহ'র বিধান (1) রোযা/রমযানের বিধান ও ফযীলত (9) সুন্নাত ও আদব/ মাদানী ফুল (38) হজ্ব-ওমরাহ ও যিয়ারতে মদিনা (27)

আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন